ষষ্ঠী তিথিতে বিভিন্ন ষষ্ঠীব্রতের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রকারে সন্তানের মঙ্গল কামনা, maa sasthi brotokotha in bengali
সন্তানদাত্রী ও সন্তান রক্ষাকর্ত্রী দেবী
মা ষষ্ঠীদেবী বা ষষ্ঠীঠাকুর হলেন বাংলার ও বহির বাংলার সনাতন (হিন্দু )ধর্মাবলম্বী এক পৌরাণিক দেবী। পুরাণ মতে যেহেতু তিনি আদি প্রকৃতির ষষ্ঠাঙ্গ অংশভুতা তাই তাহার নাম ষষ্ঠী দেবী। মা সন্তানদাত্রী ও সন্তান রক্ষাকর্ত্রী দেবী নামে প্রচলিত। তার কৃপায় নিঃসন্তান দম্পতিদের সন্তান প্রাপ্তি হয় এবং তিনিই সন্তানের রক্ষা করেন। মা ষষ্ঠী যেহেতু শিশু রক্ষয়ত্রী ও সন্তানপ্রদায়িনী তাই এই ব্রতের মূল লক্ষ্য হল সন্তানের মঙ্গলকামনা। তাই বারো মাসে বারোটি শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে বিভিন্ন ষষ্ঠীব্রতের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রকারে সন্তানের মঙ্গল কামনা,আয়ু বৃদ্ধি, ও সুস্বাস্থের জন্যে মায়েরা ব্রত রাখেন।
![]() |
| মা ষষ্ঠীদেবী |
- মা ষষ্ঠীর পূজা সময় —
সনাতন হিন্দু শাস্ত্রানুসারে হিন্দু বর্ষ পঞ্জীকার, প্রতিমাসের শুক্লাষষ্ঠী তিথিতে বিভিন্ন নামে মা ষষ্ঠীদেবী পূজিতা হন ।
এছাড়া, শিশুর জন্মের পর 'সূতিকাষষ্ঠী , ষষ্ঠ দিনে 'ঘাটষষ্ঠী', একুশদিনে 'একুশে' এবং শিশুর বারো বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি জন্মতিথিতে 'জলষষ্ঠী' দেবীর পৃূজা হয়ে থাকে।
হয়।স্থানভেদে এই পূজা আবার বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন —
- বৈশাখ মাসেঃ- ধুলাষষ্ঠী, চন্দনষষ্ঠী বা চান্দনী ষষ্ঠী
- জ্যৈষ্ঠমাসেঃ- জামাই ষষ্ঠী,অরণ্য ষষ্ঠী,স্কন্দষষ্ঠী,বাটাষষ্ঠী
- আষাঢ়মাসেঃ- কোড়াষষ্ঠী,কদমষষ্ঠী,কার্দমীষষ্ঠী,কর্দ্দমষষ্ঠী(বিপত্তারিণী)
- শ্রাবণমাসেঃ- লোটনষষ্ঠী, লুণ্ঠনষষ্ঠী
- ভাদ্রমাসেঃ- মাথানীষষ্ঠী,মন্থনষষ্ঠী,চর্পটাষষ্ঠী,চাপড়াষষ্ঠী,সূর্যষষ্ঠী,অক্ষয়ষষ্ঠী, সরদেশীষষ্ঠী,
- আশ্বিনমাসেঃ- দূর্গাষষ্ঠী,বোধনষষ্ঠী
- কার্ত্তিকমাসেঃ- কার্ত্তিকষষ্ঠী, নাড়ীষষ্ঠী(ছট পূজা)
- অগ্রহায়ণ মাসেঃ- মূলাষষ্ঠী,গুহাষষ্ঠী,মূলকষষ্ঠী,মূলকরূপিণীষষ্ঠী
- পৌষমাসেঃ-পাটাইষষ্ঠী,অন্নরূপাষষ্ঠী
- মাঘমাসেঃ- শীতলষষ্ঠী
- ফাল্গুনমাসেঃ-অশোকষষ্ঠী,গোরূপিণীষষ্ঠী
- চৈত্র মাসেঃ- নীলষষ্ঠী,স্কন্দষষ্ঠী।
- মা ষষ্ঠীদেবীর বিগ্রহ—
এই দেবীর নির্দিষ্ট অবয়ব নেই। মঙ্গল ঘটে আঁকা মূর্তি, শিল, পিটুলি দিয়ে তৈরি মূর্তি, ঘটে পোঁতা বটগাছের ডাল ইত্যাদিতে ষষ্ঠীদেবীর প্রতিমা কল্পনা করা হয়। দেবীর বাহন কালো বিড়াল। তবে তার সম্পর্কে ধ্যানমন্ত্রগুলির সার কথা হল-গৌরবর্ণা দ্বিভূজা দেবী। উত্তম বসন ও অলঙ্কার পরিহিতা। চন্দ্রাননা ও কৃষ্ণমার্জার বাহনা।পীনোন্নত পয়োধরা। কোলে একাধিক শিশুপুত্র। অনেকের মতে দেবীর বিড়াল বাহনের মূলে রয়েছে দেবী জগদ্ধাত্রীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কেননা বিড়াল বাঘ না হলেও বাঘের মাসি বলে সুপরিচিত। স্বামী নির্মলানন্দ তার 'দেব-দেবী ও তাদের বাহন'গ্রন্থে লিখেছেন যে বিড়াল হলো প্রজনন শক্তির প্রতীক। আর বিড়ালির দুগ্ধ নাকি স্ত্রীরোগের আরোগ্যলাভের অন্যতম মেডিসিন। এমন প্রাচীন লোকবিশ্বাসের সূত্র ধরেই নাকি ষষ্ঠীর বাহন বিড়াল।![]() |
| maa sasthi brotokotha in bengali |
- মা ষষ্ঠী দেবীর পূজা —
ষষ্ঠীদেবীর পূজা সাধারণত বটগাছতলায়, বাড়ির আঙিনায়, নদী বা পুকুরের ধারে হয়ে থাকে। বটতলাই হলো ষষ্ঠীর আ
টন। এই কারণে তাকে বটবিটপবিলাসী বলা হয়েছে। অনেক গ্রামে বট-অশ্বত্থ বৃক্ষমূলে 'ষষ্ঠীতলা' বলে নির্দিষ্ট স্থানে বিভিন্ন ষষ্ঠীদেবী নির্দিষ্ট তিথিতে পূজিতা হন। মূলত গৃহস্থ নারীরা তেল-হলুদ-দই, ঘট, বটের ডাল ইত্যাদি উপকরণের মাধ্যমে পূজা নির্বাহ করে থাকেন, পূজাশেষে 'ব্রতকথা' শ্রবণ করে স্নান সেরে বাড়ি ফিরে ফলাহার করেন।
(পূজার তিথি অনুসারে নিয়ম ভিন্ন হতেপারে।)
![]() |
| ষষ্ঠীতলা |
- অন্যান্য পূজা —
বর্ণহিন্দু নবশাখ গোষ্ঠীর মহিলারা ষষ্ঠীর ব্রত করলেও তথাকথিত অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের রমণীরা শুধুমাত্র অরণ্য ও শীতলা ষষ্ঠী ব্রত পালন করেন। তবে সন্তান প্রসব করার ছয় দিন পরে ষেটেরা বা ষষ্ঠীপুজো গ্রামাঞ্চলের হিন্দুমাত্রই পালন করে থাকেন।
মধ্যযুগীয় বাংলাকাব্যে শিশুজন্মের পর ষেটেরা ,আটকলাই, নর্তা, একতির্সা প্রভৃতি উৎসব পালন করার বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে।শিশু জন্মের ছয় দিনের মাথায় গো-ভাগার থেকে গো-মুন্ড নিয়ে এসে আঁতুরঘরের দরজায় পোঁতা হতো।এখন আর লোকাচারটি পালিত না হলেও এই দিনে প্রথম মায়ে-ছা'য়ে স্নান করার বিধি আছে।সন্তানের জন্মের ষষ্ঠ দিনে যে ষষ্ঠী পুজা করা হয় তা সূতিকা ষষ্ঠীবা ঘাটষষ্ঠী নামে পরিচিত। জন্মের একুশ দিনে আবার যে ষষ্ঠীর পূজা হয় তা একুশে, একুশ্যা বা শুদ্ধষষ্ঠী বলে।
ষষ্ঠীদেবীর মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য সৃষ্ট 'ষষ্ঠীমঙ্গল' পালার গীতিনাট্যাভিনয় অনেক সন্তানহীনের গৃহে সন্তানের কামনায় বা সন্তানলাভের পর মানসিক পূরণের পর অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
উত্তরপ্রদেশের কিছু অঞ্চলে ও সম্পূর্ণ বিহার ও মিথিলাঞ্চলে এই ষষ্ঠীদেবী ও সূর্য্যদেবতারই উদ্দেশ্যেই চৈত্র ও কার্তিক শুক্লা ষষ্ঠী তে ছট্-পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সেইখানের লোক ভাষাতে দেবীকে ছঠী-মাই বলে সম্বোধিত করা হয়। এই ব্রত বিহার ও মিথিলাঞ্চলের গৃহস্থদের সবথেকে কঠিনতম ব্রতের মধ্যে অন্যতম।
ছট এবং সূর্যের সম্মানে বিহারে, প্রতি বছর দুইবার ব্রত পালন করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের উড়িষ্যা-সন্নিহিত মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বর্ধমান বিভিন্ন জায়গায় এই পালার প্রচলন আছে।



COMMENTS